বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮

ব্লগ: কলমবাজের জানলা/ ২ নিজের স্ট্যাচু নিজে নির্মাণ করলেই কি আর অবিনশ্বর হওয়া যায়?

হিন্দোল ভট্টাচার্য

আমাদের এই বাংলার এক গভীর সমস্যা হচ্ছে ক্ষুদ্র রাজনীতি। কথা উঠতেই পারে, রাজনীতির আবার ক্ষুদ্র, বৃহৎ কী। রাজনীতি হল ক্ষমতা দখলের নীতি। আর ভালোবাসা ও যুদ্ধে কিছুই অনৈতিক নয়। সে তো সেই আদিকাল থেকেই আছে। কিন্তু আজকের যুগ আবার আগের থেকে অনেক পালটে যাওয়া, সেটিও তো সত্য। আজকের যুগের আসল কথা হল সত্য নির্মাণ। আর এই নির্মাণের রাজনীতি যেমন করে মার্কিন সরকার, যেমন করে সারা বিশ্বের  বহুজাতিক কোম্পানিগুলো, যুদ্ধপ্রেমী রাষ্ট্রসংঘ, ফ্যাসিস্ট হিন্দুত্ববাদী, তালিবানিরা করে, তেমন করে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলিও। রাজনীতি এখন খুব ভালো করে জানে, সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করাটা জরুরি। আর সংস্কৃতিও নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়।

তাহলে রাজনীতির আরেক রূপ হল, সম্ভাব্য সত্যের রূপগুলি কী কী তা জেনেও, সেই সব সত্যগুলিকে নির্মাণ করে চলা কিছু কিছু ক্ষমতার হাত ধরে। এটি হল ক্ষুদ্র রাজনীতি, কারণ এই রাজনীতি আসলে অল্প কিছু মানুষের নিজস্ব সংকটগুলিকে ছাপিয়ে নিজ নিজ ক্ষমতার আধারগুলিকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ বিশেষ সত্য নির্মাণের রাজনীতি।

আমাদের বাংলায় এই সংকীর্ণ অথচ ক্ষুদ্র রাজনীতির চল সেই গত শতকের প্রথম থেকেই। আর তা ঢেকে দিয়েছে সবসময় সমসময়ের মেজর কাজগুলিকে। বা, বলা ভালো, মেজর কাজ/ শিল্পীরা যাতে উপযুক্ত সম্মান না পায়, প্রচার না পায়, তার জন্য এক বিশেষ ধরনের সত্যনির্মাণ কাজ করেছে। আর সেই  নির্মাণে সাহায্য করেছে সমসময়ের ক্ষমতা। কারণ ক্ষমতাও চায়, আদি বিক্রমাদিত্যের মতো সভাকবি, সভাশিল্পী, সভাবৈজ্ঞানিক ইত্যাদি, যাদের যদি কিছু জিজ্ঞেস করেন স্বয়ং রাজা, তার প্রশ্নের জবাবে তাঁরা বলবেন- ঠিক, ঠিক, ঠিক। অর্থাৎ ক্ষমতার সঙ্গে, ক্ষমতার বিপরীতে কোনও প্রত্যক্ষ বিরোধী ডায়ালগে তাঁরা যাবেন না।

ভাস্কর চক্রবর্তী, গৌতম বসু, গৌতম চৌধুরী, একরাম আলি, রণজিৎ দাশ, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী, দেবদাস আচার্য, গীতা চট্টোপাধ্যায়, রমা ঘোষ, লোকনাথ ভট্টাচার্য, বীতশোক ভট্টাচার্য, হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বদেশ সেন, অমিতাভ মণ্ডল, দেবাশিস তরফদার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভু রক্ষিত, অনুরাধা মহাপাত্র, অমিতাভ মৈত্র সুব্রত চক্রবর্তী, মানিক চক্রবর্তী, তুষার চৌধুরী, তুষার রায়, অনন্য রায়, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত—কত নাম মনে আসে, যাঁরা বাংলার অন্যতম প্রধান কবি। শ্রেষ্ঠ কবি। কিন্তু মুশকিল হলো, এমন এক সত্য নির্মাণের খেলা চলছে, তাতে রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান-গোষ্ঠী-সব মিলেমিশে রচনা করছে এক ভয়ংকর মধ্যমেধার সংকীর্ণ পারস্পরিকতা। কে পড়েছে বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা? পড়েছে কি নিশীথ ভড়ের লেখা? তাহলে যাঁরা পড়েননি, বা পড়েও যাঁরা বিচার করছেন কারা বাংলা ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ, তাঁরা আসলে কী করছেন? একটা ছায়ার অন্তরালে ঢেকে রাখছেন সত্যকে। উল্টোদিকে তৈরি করছেন একটা সত্য। যে সত্য তৈরি হচ্ছে, তাকে মিথ্যে বলা কিছুতেই যাবে না। কিন্তু উল্টোদিকের সত্য ঢাকা থাকায়, সেই সত্য বহুল প্রচলিত হচ্ছে না। গদ্য সাহিত্য সম্পর্কেও বলা চলে তাই। বাংলার অত্যন্ত শক্তিশালী গদ্যসাহিত্যের আবহমানতায় আমরা পেয়ে চাই মানিক-বিভূতি-তারাশংকরকে। পেয়ে যাই শরদিন্দু-সুবোধ ঘোষ- আশাপূর্ণা- নরেন্দ্রনাথ মিত্র- সতীনাথ ভাদুড়ী- নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়-প্রেমাংকুর আতর্থী- সমরেশ বসুকে। পেয়ে যাই ন্যারেটিভকে ভেঙে দেওয়া গদ্যে বাসুদেব দাশগুপ্ত- অরূপরতন বসুদের। পেয়ে যাই সন্দীপন-দেবেশ রায়- কমলকুমার-অমিয়ভূষণ-অভিজিৎ সেন-নবারুণ-ইলিয়াসের লেখা (বাপরে বাপ কী সব লেখা)। কিন্তু তারপর? এক ভয়াবহ ধ্বস। কিন্তু ধ্বসের উল্টোদিকে যে বাগান তৈরি হচ্ছে, তা কি সকলে জানবে না? এই হচ্ছে আসল কথা। একপ্রকার সত্য উঠে আসুক। কারণ সেই সত্য-ও শ্রেষ্ঠ। অন্য প্রকার সত্য-ও আড়ালে না থাকুক। কারণ তা-ও সত্য।

সত্য নির্মাণ করে, যে বিভিন্ন সত্যের উপস্থিতিকে ঢাকা যায় না, তা তো আমরা দেখতেই পাই। কিন্তু ভয় অন্য। যাঁরা নতুন লিখতে আসছেন, তাঁরা পড়ছেন তো সত্যের এই বিভিন্ন রূপকে? যাঁরা নতুন করে ভাবার কথা ভাবছেন, তাঁরা ভাবছেন না তো, এই যে দেখানো সত্য, নির্মিত সত্য, তাহাই একমাত্র?

বিশ্বদেব, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল-গৌতম বসু- গৌতম চৌধুরী বা অরূপরতন-সন্দীপন-অমিয়ভূষণ  না পড়লে যে জানতেই পারবেন না, কোথায় বাংলা সাহিত্যের স্রোত আগামীর দিকে বয়ে চলেছে। ইভেন্ট সত্য, কিন্তু শেষ সত্য নয়। সামাজিক-রাজনৈতিক সত্ত্বা সত্য, কিন্তু নির্মিত সত্য। কবি কিছুই হারায় না। কারণ কবি প্রকৃত পক্ষে সব ক্ষমতাকে থোড়াই পরোয়া করেন। তিনি প্রশ্ন করতে ভয় পান না।

মৃত্যু এক ভয়ংকর সত্য। তাই বলে জীবন মিথ্যে নয়। তাই মৃত্যুকে অন্তত ভয় পেয়ে তো সত্যের আরেক রূপগুলির কথা বলুন। কারণ আপনিও নশ্বর, আর যা যা সত্য, সেসব নশ্বর। আপনার কাজ যদি হয় স্ট্যাচু নির্মাণ করা, তা করে যেতেই পারেন। তবে যে কোনও স্ট্যাচুতে ক্ষয় হয়। আর যে কবি নিজের স্ট্যাচু নিজেই নির্মাণ করেন, তিনি তো মারাই গেছেন তাই না? কে আর হৃদয় খুঁড়ে সমাধি বানাতে ভালোবাসে, বলুন।

অন্তত কোনও কবি তো তা চান না।

(হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার।)

Leave A Reply