বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮

ব্লগ: ধূমপান নিষেধ

সন্দীপ বিশ্বাস

বিছানায় শুইয়া সিগারেট টানিতেছিলাম । সারাদিনে বড় খাটুনি গিয়াছে । ক্লান্তিতে চোখের পাতা বুঁজিয়া আসিতেছিল । হঠাৎ পিঠ চুলকাইবার জন্য সিগারেটটি হাতবদল করিতে গিয়া দেখি তাহা সম্ভব হইতেছে না … কারণ, উহা আমার ডান হাতের তর্জনী ও মধ্যমার মাঝে আটকাইয়া গিয়াছে । প্রথমে খুব আশ্চর্য হইলাম । বাঁ হাত দিয়া টানিয়া সিগারেটটিকে বাহির করিবার চেষ্টা করিলাম – পারিলাম না । হাত ঝাড়া দিতে লাগিলাম – কিছুই হইল না । দুই আঙুলের সহিত সমকোণ করিয়া ষষ্ঠাঙ্গুলির ন্যায় দুগ্ধ-শুভ্র বস্তুটি যথারীতি শোভা পাইতে লাগিল । ভারী বিরক্ত লাগিল … ইহা আবার কোন আজব উপদ্রবের সম্মুখীন হওয়া গেল !

সিগারেটটি কিন্তু জ্বলিতেছে, তবে বড়ই ধীরগতিতে । এতক্ষণে উহার সম্পূর্ণ পুড়িয়া যাইবার কথা ছিল, কিন্তু লক্ষ্য করিয়া দেখি এখনও প্রায় অর্ধেক বাকি আছে । কি করিয়া এই সমস্যা হইতে উদ্ধার পাওয়া যায় ভাবিতে ভাবিতে সুখটান দিতে লাগিলাম ।

গুটিকয় টান দিয়াই মনে বড় আনন্দ হইল – অক্ষয় সিগারেটের মালিক হইয়াছি, ধূমপান লইয়া আমার আর চিন্তা কি ? পয়সা খরচ করিতে হইবে না, প্রত্যহ কিনিবার ঝামেলা নাই, এমনকি জ্বালাইবার কষ্টেরও আর প্রয়োজন রহিল না ! এখন হইতে বাৎসরিক বাজেটের প্রতি তরুণ কদলী প্রদর্শন করিয়া পরমানন্দে ধূমপান করিতে পারিব । যেখানেই যাই, যাহাই করি, জ্বলন্ত সিগারেটটি সর্বদা মুখের সামনে প্রস্তুত থাকিবে … যেন মনিবের গড়গড়ার নল হাতে লইয়া বিশ্বস্ত ভৃত্যটি !

বসিয়া বসিয়া এইসব আকাশ-পাতাল ভাবিতেছি, সহসা অন্য এক চিন্তা মনে উদয় হইল । সিগারেটটি তো সত্যিই অক্ষয় নয় – উহা পুড়িতেছে, ধীরগতিতে হইলেও ক্রমশঃই ছোট হইয়া আসিতেছে ! সম্পূর্ণ জ্বলিয়া শেষ হইবার কালে উহা আমার আঙুলে অগ্নিসংযোগ করিয়া দিয়া যাইবে … সেই জ্বলনের কথা চিন্তা করিয়া লাফাইয়া উঠিলাম । ভাবিলাম, আপাততঃ উহার অগ্নি নির্বাপন করা যাক । বহুক্ষণ যাবৎ ধূমপান করিতেছি, এখন একটু বিরাম দিই । পরে প্রয়োজনমতো জ্বালাইয়া লইব ।

ডান হাতের তালু চিৎ করিয়া অগ্নিখন্ডটিকে চাপিয়া ধরিলাম ছাইদানের উপর । আগুন নিভিল না । তবে তো বড় মুস্কিল – কি করা যায় ! ভাবিলাম আগার দিক হইতে অগ্নিসমেত সামান্য অংশ কাটিয়া বাদ দিয়া দিব । ব্লেড দিয়া চেষ্টা করিলাম – কাটা গেল না । ছোট-বড় নানাবিধ কাঁচিও ব্যর্থ হইল । তারপর ক্ষুরধার ছুরিকা দিয়া চেষ্টাও বিফলে গেল । সবশেষে মুখের মধ্যে সাবধানে অগ্নিখন্ডটিকে প্রবেশ করাইয়া দাঁত দিয়া কাটিবার চেষ্টা করিলাম … বাপরে, কি ভীষণ শক্ত ! দাঁত প্রায় ভাঙিয়া গেল,কিন্তু সামান্যতম আঁচড়ও কাটিতে পারিলাম না । বিরক্তি চরমে উঠিল । এক বড়সড় হাতুড়ি জোগাড় করিলাম – হাত বাঁচাইয়া মারিলাম আপন ষষ্ঠ আঙুলে এক ঘা । কিছুই হইল না । বার বার ঘা মারিতে লাগিলাম … সিগারেটটির বিন্দুমাত্র বিকৃতিও চোখে পড়িল না ।

হতাশভাবে বসিয়া পড়িলাম । আর মাত্র এক-চতুর্থাংশ বাকি – কি করিয়া যে ইহার হাত হইতে মুক্তি পাইব ভাবিয়া পাইলাম না । ধূমপানে আর কোনো আসক্তি নাই,পরিবর্তে দেখা দিয়াছে আতঙ্ক । কতক্ষণ আর এই জ্বলন্ত বস্তুটিকে বহন করিয়া বেড়াইব শরীরের অঙ্গের মতো ? শেষ পর্যন্ত এই আগুনে পুড়িয়াই কি মরিতে হইবে ? বড় ভয় হইল । সেই কিশোরবেলা হইতে আজ পর্যন্ত যত সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করিয়াছি – আজ কি তাহারই শোধ দিতে হইবে আগুনে আত্মাহুতি দিয়া ? নাঃ,এই বিপদের হাত হইতে নিস্তারের উপায় বাহির করিতেই হইবে ! অগ্নি-নির্বাপনের বিবিধ পন্থার বিষয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করিতে লাগিলাম ।

সহসা আনন্দে হৃদয় দুলিয়া উঠিল … এই সহজ উপায়টি এতক্ষণ কেন মাথায় আসে নাই ? সবার আগে ইহাই তো মনে আসিবার কথা ছিল ! এইবারে নিশ্চয়ই সফল হইব ! স্নানঘরে ছিল জলপূর্ণ এক বালতি – লাফাইয়া গিয়া উহার মধ্যে হাত ডুবাইয়া দিলাম । এতক্ষণে শান্তি । মুক্তি পাওয়া গেল অবশেষে ! হাত বাহির করিয়া দেখি … কোথায় কি ? আগুন সমান তেজে জ্বলিতেছে ! সিগারেটের গোড়ায় পৌঁছাইতে আর অধিক বিলম্বও নাই । সাদা শয়তানটির গায়ে একবিন্দু জলও লাগে নাই, হয় নাই সামান্যতম পরিবর্তনও ! আমার এত চেষ্টায় উহার যেন কিছুই যায়-আসে না ! কিন্তু আমাকে তো রোধ করিতেই হইবে অগ্নির অগ্রগমন … এবং যত শীঘ্র সম্ভব ! উন্মাদের মতো জলের মধ্যে ঘুঁষি মারিতে লাগিলাম … সারা গায়ে জলকণা ছিটিয়া ভিজিয়া গেলাম সম্পূর্ণ … আর ঠিক তখনই আগুন স্পর্শ করিল আমার আঙুল ।

প্রচন্ড জ্বালায় নিদ্রা ছুটিয়া গেল । দেখি সিগারেটটি পুড়িয়া শেষ হইয়া গিয়াছে, আর ছ্যাঁকা লাগাইতেছে আমার আঙুলে । তাড়াতাড়ি হাত ঝাড়া দিলাম … অতি সহজেই হাত হইতে বস্তুটি পড়িয়া গেল । দেখিলাম – সারা শরীর ভিজিয়া গিয়াছে ঘামে ।

নাঃ । ধূমপান ছাড়িয়াই দিব ভাবিতেছি !

(ব্যাঙ্গালোর নিবাসী, পেশায় সফটওয়্যার এঞ্জিনিয়ার । মাঝে-মধ্যে লেখার বাতিক । হাস্যরসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ।)

Leave A Reply