বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮

দিল্লির চিঠি – ১

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

সলমানের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল  । নিজ়ামুদ্দিনের দরগায়।

শীত শুরুর দিল্লিতে রাত এমনিতেই বেশ মায়াবী। এই বৃষ্টিহীন শহরে একমাত্র নরম ঋতু এই শীত। তার আগমণ। তার বিদায় ও মার্চ অব্দি থেকে যাওয়া রেশ।

হলুদ আলোয় ব্যাপিত নিজ়ামুদ্দিন চত্তর। দরগাহ। আমার খালি পা। সঙ্গে বিদেশী তরুণ কবি। অনেক দিনের বন্ধু সে, ভারত নামক প্রাচীনতার কাছে শিখতে এসে এদেশের নবীন জটিলতায় আক্রান্ত।

আধ্যাত্মিকতা নেই আমাদের দু’জনেরই। কিন্তু আমরা তবুও চলে আসি এই নিজ়ামুদ্দিনের দরগাহে। শীতের যে কোনও বৃহস্পতিবার। সন্ধে থেকে রাত। সাধারণত বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলা এখানে কাওয়ালি। আমরা আসি। মজে যাই আমির খুসরু দেলহাবি নামক এক কবি ও সঙ্গীত রচয়িতার বয়ানে। ভাবতে থাকি এই সেই দরগাহ। এই সেই অঞ্চল যেখানে আমির খুসরু আসতেন। আসতেন কি?

হজ়রত নিজ়ামুদ্দিন তো তাঁর গুরু। নিশ্চয় আসতেন।

অন্ততঃ আলাউদ্দিন খিলজির রাজস্থান আক্রমণের পর আর কি কোথাও যাবার ছিল? আমির সেখানে রাজকবি। যুদ্ধের ধারাবিবরণী লিখেছেন। রণথম্ভোর এর যুদ্ধের না হয় কারণ ছিল। আলাউদ্দিন খিলজির কাছে গুরুত্ব না পাওয়া স্ত্রী চিমনা বেগম ও আলাউদ্দিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষি  সৈন্য মহম্মদ শাহ এর সঙ্গে রাজস্থানের ওই অংশের রাজা হামির দেব এর সন্ধি ও চক্রান্ত। যুদ্ধ ও আলাউদ্দিনের জয়। কিন্তু মেবার? ১৩০২ সালে মেবারের রাণী পদ্মিনীর সৌন্দর্যতাড়িত যে যুদ্ধ সে তো শুধুই রক্তপাত। অনেক রমণীর সতী হওয়া। কবি আমির খুসরু কি এইসব সহ্য করতেন আলাউদ্দিনের রাজকবির পদে? তিনি কীভাবে লিখতেন ধারাবিবরণী? অথচ লিখেছেন। দীর্ঘ ৮ বছর। এরই মধ্যে কি তিনি নিজের লেখাও লিখেছেন?

নানা প্রশ্নে জড়িয়ে যাই আমি।  আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায় নিজ়ামুদ্দিন আউলিয়ার দরগাহে। যার দেহে শুধু মানুষের বিশ্বাসের সুতো জড়ানো। আমরা তো দুর্বলতাকেই গিঁট দিয়ে শক্ত করি। দেখি। হলুদ আলো ও সুতোয় পেঁচিয়ে যাচ্ছে সময়। আমির খুসরু এসেছেন সেই সালতানাত থেকে। শাহি দিল্লির সালতানাত। নিজ়ামুদ্দিন আউলিয়া তাঁর প্রিয় শিষ্যগণ নিয়ে আছেন তো সেই ফজরের নামাজকাল থেকে। এসেছেন আমির প্রায় যোহরের কাল এসে গেল। সূর্য এই দিল্লির কাঁটা গাছে ভরা মার্চমাসে তার ঝলস দেখাচ্ছে তখন। আমিরকে দেখে আউলিয়ার চোখে জল। কেউ তার মতো নেই। নাসিরুদ্দিন চিরাগ বা আকি সিরাজ কেউ নয়।

আকি তো আবার গৌড়ে ফিরে যাবে। আমির একাই নিয়েছে শব্দের দায়। সে বলে ঈশ্বর শব্দেই থাকেন। শুষ্ক সাধনায় তিনি হারিয়ে যান। নিজ়ামুদ্দিন আউলিয়া বৃদ্ধ জ্ঞানী মাথায় চেয়ে থাকেন। তাঁর বয়স এই ১৩১০ খৃষ্টাব্দে ৭২। আর শিষ্য আমীরের ৫৭। সেই প্রথমবার তার আসাটা মনে পড়ে তাঁর। কাউকেই ঢুকতে বাধা দেননা আউলিয়া। ঈশ্বরের দুনিয়ায় সকলে মুক্ত তাঁর বাণীর জন্য। কিন্তু আমির তার তীক্ষ্ণনাসা উপস্থিতি। সে তো রাজপুরুষ। আউলিয়া তো কবেই বলেছেন আর যাই করো রাজপুরুষের সঙ্গে মেশা যাবে না। গরীবের কথা ভাবতে হবে।

হঠাৎ আমার তাল কেটে যায়। সলমান নামক ছেলেটির আগমনে। আমার বিদেশী বন্ধু আমার সঙ্গে আলাপ করায়। সলমানও বিদেশী। সে এসেছে সুদূর সিরিয়া থেকে। গৃহযুদ্ধে প্রাণ বাঁচিয়ে। আমার মুখটা নরম হয়ে এসেছে প্রৌঢ় মানুষের অতুলপ্রসাদী শোনার মুহূর্তের মত। অকস্মাত যেমন কোনও কোনও মুহূর্তে মনে হয় সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া যায়, তেমন।

মাথার পিছনে নিজ়ামুদ্দিন আউলিয়া ও তার শব্দবাদী শিষ্য আমির খুসরু। সামনে সলমান দারবিশ। আমার সাহেব বন্ধু বলে চলে। সলমান চেলো বাজায়। সে খুব মেধাবী বাজিয়ে। ইওরোপের বৃত্তি পেয়ে ইওরোপে ধ্রুপদী বাজনা শিখেছে। তারপর ফিরেছিল দেশে। ধাপে ধাপে খুলেছিল ধ্রুপদী বাজনার ইশকুল।

আমি ভাবতে থাকি ভূমধ্যসাগরের পাড়ের সিরিয়ার কথা। আমি জানি সেখানে যুদ্ধ চলছে।  যুদ্ধ চলছে তার পাশের অনেক দেশে। কোথাও আপাত শান্তির আড়ালে সেনানায়ক, কোথাও যুদ্ধ। এখন আর যুদ্ধ থামেনা। শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে একের পর এক হতে থাকে। সলমান আমাকে বলে সে ছোটবেলায় শুনেছিল ভারতের সুফিদের কথা। কিন্তু সে ভাবেনি কখনও এদেশে হাজির হবে এবং উপস্থিত হবে এই পীঠে।

আমি তাকে প্রশ্ন করি সে দিল্লিতে বাজায় কিনা। উত্তর স্বাভাবিক নেতিবাচক। সে দেশ থেকে পালাবার সময় যন্ত্র আনতে পারেনি। সে এখানে আসার পর শুধু তার দ্বিতীয় বাজনা বেস গিটার নিয়ে বেঁচে আছে। দু একটা জ্যাজ় বারে বাজানোর ডাক পায়। সাহেব বন্ধুদের কল্যাণে। সে জানতনা এই বৃহস্পতিবার ও কাওয়ালি নামক সঙ্গীতসন্ধের কথা।

ততক্ষণে শুরু হয়েছে গান। এ গান আমির খুসরুরই লেখা। এ দরগায় গীত সমস্ত সঙ্গীতই প্রায় তাঁর। আমি বলি সলমানকে। সলমান, বুঝি মজে যাচ্ছে গানে। সুরে। হলুদ আলোর মায়ায় ও শিহরনে। আমি চোখ ফেরাই। নানা দেশের ট্যুর পিপাসুদের অস্থিরতা। একেবারে পাতি ভ্রমণের রাজধানী । কন্ডাক্টেড সৌন্দর্য সফর ও তার উৎপাদিত বিরক্তি।

আমার কানে তরুণ কবি বলল গত পরশুদিন বোমায় ধ্বংস হয়েছে সলমানের বাড়ি। সেখানেই ছিল তার চেলো। তার স্বরলিপি। তারপর থেকে ছেলেটা শুধুই থম মেরে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করেনি। আজ জোর করে বের করা হয়েছে তাকে। মনে হয় যেন সলমানের চোখে মৃদু জল। অন্ততঃ ছলছল করছেই।

আবার  ভাবি কবে থেকেই তো নিজ়ামুদ্দিন আউলিয়া তাঁর দরগাহ খুলে দিয়েছিলেন। আমির কেন অত পরে এসেছিলেন? দীর্ঘ ৮ বছরের রক্তক্ষয় ও তার বর্ণনা কি আমিরকে ক্লান্ত করেছিল? একটানা সুলতান ও তার ক্ষমতার খেলা। আমিরও কি চুপ করে গিয়েছিলেন? মনে হয় যেন দেখতে পাচ্ছি যুদ্ধতাড়িত, রক্তক্লান্ত আমির খুসরুর প্রথম দিন আউলিয়ার কাছে আসার মুহূর্ত। ৫৭ বছর বয়স। এখন শুধুই শব্দ সাধনা। ১৩১০ সাল। এখন এই ২০১৩ সালে আমির খুসরুর মুখে বসে যাচ্ছে সলমান দারবিশের মুখ। যুদ্ধে সুর হারানো মুখ। খোয়াজা কৃপা করো…

(শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।)

Leave A Reply