বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮

ছাতিমতলা/২

হাট হারানো উন্নয়নে

আবীর মুখোপাধ্যায়

জয়ের ‘জলঝারি’র কথা মনে আছে— ক্যানেলের ধারে সেই ছেলেটি আর সেই মেয়েটিকে?… নিরিবিলি তাহাদের কথা আর উপকথন? কিংবা শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ছবি ‘বেলাশেষে’র সৌমিত্র-স্বাতীলেখার সোনাঝুরির বিজনে সংলাপ-দৃশ্য?

শান্তিনিকেতনে সোনাঝুরির সিকোয়েন্স মানেই সাঁওতাল গ্রাম ছুঁয়ে এমন ছায়া সুনিবিড় অরণ্যের দিনরাত্রি। দীর্ঘ গাছেদের সংসারে সহজিয়া পল্লির জীবন, জলরঙে আঁকা মনকেমনের কবিতা-ক্যানভাস। প্রায় দু’দশক আগে শনিবার শনিবার এখানেই শুরু হয়েছিল গ্রাম্য এক হাট। যার নামটি ছিল ‘খোয়াই বনের অন্য হাট।’

দুপুর দুপুর বনেরপুকুরডাঙা থেকে কেউ আসত ঢেঁকি ছাঁটা চাল,শাক-পাতা, কলাটা-মুলোটা নিয়ে। হাঁটা পথে সরপুকুরডাঙা কিংবা চরকিডাঙা থেকে কেউ কেউ আসত পিঠেপুলি, লাল-চা, নিজেদের তৈরি কাটুমকুটুম নিয়ে। বাড়িতে এটা-সেটা বানিয়ে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক-অধ্যাপিকারাও সে হাটে এসে বসতেন।

ভিড় বলতে তখন হাটে সাকুল্যে শ’দুয়েক মাথা!

পাড়া-পড়শি, হাটুরে আর ছাত্রছাত্রীদের বিশ-ত্রিশ খানা সাইকেল, খান-দশেক রিকশা আর ঘণ্টা তিনেকের বিকিকিনি!

তারপর বিকেল ফুরোতেই গুটিকয়েক বাউল আর হাটুরেরা তল্পি-তল্পা গুটিয়ে হাঁটা দেবে। কলাভবনের মেয়েটি আর বাংলাবিভাগের ছেলেটি সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখবে। কেন না, ততক্ষণে শেষ রোদে রাঙা চিকচিক ক্যানালের কালো জলে ছায়ার দীর্ঘ হচ্ছে আর হচ্ছে। সোনাঝুরিপল্লির পথে চরকি সোরেন, লখাই মুর্মু মিহি গলায় পরস্পর বিকিকিনির হিসেব করতে করতে ফিরে যাচ্ছে আর যাচ্ছে।

হঠাৎ হাওয়ায় পাক খেয়ে খেয়ে নিভৃত বনে, পূর্ণিমার আলোয় ঝরে পড়ছে আর পড়ছে শুকনো পাতারা। কোথায় যে হারাল ঝিলমিল মায়াকাননের সেই সোনাঝুরি হাট! শনিবার মানে এখন ভিড়… টোটোর মিছিল, বনের দফারফা। স্বপ্নভঙ্গের বাজার!

বাজার— মাচা, ছাউনি, ইউরেনাল, পুলিশ বুথ। যানজট ঠেলে কাতারে কাতারে ক্রেতা-বিক্রেতার হল্লা। শ্যামবাটি ক্যানাল পার হতেই পিচ রাস্তার দু’ধারে সে বাজারের শুরু। শেষ যে কোথায়— শেষ নাহি যে!

মা‌লুম হয়, উন্নয়ন কেবল পথে নয়, বনের ভিতরেও দাঁড়িয়ে!‌

এলোমেলো গুগল করতে করতে খোয়াই হাটের উন্নয়ন প্রসঙ্গ পড়ি, একটি কাগজের পুরনো সংস্করণ থেকে। তারা লিখছে, ‘‘চলতি বছরের মে মাসে বীরভূম জেলা সফরে শান্তিনিকেতনের খোয়াই ঘুরে দেখে নতুন করে সে সব সাজানোর কথা জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। খোয়াই-এ একটি ইকো ট্যুরিজম পার্ক করারও ঘোষণা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, পরিবেশের কথা মাথায় রেখে খোয়াই অঞ্চলে পর্যটকদের জন্য কিছু সুবিধা দেওয়া দরকার। এ কারণে সেখানে রোদ, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কিছু ছাউনি, বসার ব্যবস্থা, জলের ব্যবস্থা করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরেই এলাকা পরিদর্শন করেন জেলাশাসক পি মোহন গাঁধী। তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব পরিবেশের কথা মাথায় রেখে সাজিয়ে ফেলা হবে খোয়াই।’’

বনের মধ্যে ছাউনি! ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে মুক্তি তাহলে আর কোথায়! বনের মধ্যে রোদ, বৃষ্টি, জ্যোৎস্না ঢেকে দিতেই হবে…? এও উন্নয়ন!

‘উন্নয়ন’ কথাটার বিশদ অর্থ জানতে রিপোটার্জ ফের পড়ি, ‘‘কথা মতোই পৌষমেলার আগে মেলার মাঠ সেজে ওঠার সঙ্গেই সাজছে ‘খোয়াই বনের অন্য হাট’। রাজ্য পর্যটন দফতর, জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব বাঁশের মাচা। মোট ১০টি মাচা তৈরি করা হবে। ইতিমধ্যেই ৭টি মাচা সম্পূর্ণ হয়েছে। খোয়াইয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কোনও গাছ না কেটেই তৈরি হচ্ছে এই মাচা। কোথাও ইউক্যালিপটাস, কোথাও আবার সোনাঝুরি গাছকে ঘিরে নীচে বাঁশের মাচা, উপরে বাঁশেরই ছাউনি দিয়ে তৈরি হচ্ছে পর্যটকদের বসার জায়গা। …তৈরি হচ্ছে একটি বাউল মঞ্চও। সেখানেই মেলার ক’দিন পরিবেশিত হবে বাউল গান।’’

শ্যামলীদির কথা মনে পড়ছে। শ্যামলী খাস্তগীর। কলাভবনের এই প্রাক্তনীর উদ্যোগেই খোয়াই হাটের শুরু। একবার শ্যামলীদিকে তাঁর ‘পলাশ’ বাড়িতে বসে জিজ্ঞেস করেছিলাম — কেন এমন হাট? বলেছিলেন, ‘‘হাটের উদ্দেশ্য, স্থানীয় মানুষ বিশেষ করে মহিলাদের হস্তশিল্প, বাড়িতে করা খাবার বিক্রি করা। কেউ কেউ বাড়ির সব্জিও হাটে বিক্রি করে। নিজের আঁকা ছবি নিয়ে বসে কলাভবনের ছাত্রছাত্রীরা। সকলের মধ্যে একটা সহজ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা। যোগাযোগের সেতু হল এই হাট।’’

হাট যেদিন থেকে বাজার হল, সে দিন থেকেই সোনাঝুরি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বহু প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। তাদের অনেককে চিনি। ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে জেনেছি। নিয়ম করে যারা হাটে যেতেন, তারা এখন সপ্তাহের অন্য কোনও দিন সোনাঝুরি যান। বিজনে হাওয়ার গান শুনতে। সেও কী আর শোনা যায়!

আমি তো শুনতে পাই না!

উন্নয়নের ঢক্কা নিনাদে কানে একটু কম শোনাই ভালো।

দিন দিন সোনাঝুরিকে ঘিরে যে বেড়েই চলেছে লজ-হোটেল-বাজার-বসতি, একটু এলাকায় ঘুরলেই বোঝা যায়। হাটের বাজারীকরণ হওয়া যদি সোনাঝুরির উপর প্রথম কোপ হয়, দ্বিতীয় কোপটি এলাকায় কংক্রিটের নির্মাণের রমরমা এবং বন বেদখল হওয়া।

গত কয়েক বছরে সোনাঝুরি অঞ্চলে গড়ে ওঠা নতুন লজ-হোটেলগুলির আইনি ছাড়পত্র নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠেছে। খবরের কাগজ বলছে, রমরমিয়ে ব্যবসা করলেও সরাই বিধি অনুযায়ী অনেকের কাছে সংশ্লিষ্ট সব দফতরের কোনও ছাড়পত্র নেই। পরিবেশপ্রেমীদের দাবি, এতে বল্লভপুর অভয়ারন্যের পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। জমি মাফিয়া এবং অসাধু চক্রের যোগ সাজসে সরকারি এবং খাস জমি বেআইনি জবরদখল হয়ে যাচ্ছে। সোরগোলের পরেই, ‘বিধি না মানার’ অভিযোগে শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি এলাকার ১২ হোটেল বন্ধ করার নির্দেশ দেয় বোলপুর মহকুমা প্রশাসন। তারপর কোথায় যে সেই নির্দেশ!

পাখির ডাক শুনতে গিয়ে সে দিন সোনাঝুরিতে হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, সেই ছেলেটি আর সেই মেয়েটির কথা তো এখন আর শোনা যাচ্ছে না। খুব দূরে নয় তারা দু’জন, তবু…। বেলাশেষে’র দৃশ্যের মন্তাজ আজ কেমন যেন হঠাৎ মিউট।

এমন উন্নয়নে সোনাঝুরি বনও কেমন বুঝি চুপ করে গেছে!

(আবীর মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৮১ সালে। ছেলেবেলা কেটেছে অজয়ের স্রোত ছোঁয়ানো বীরভূমের বেজড়া গ্রামে। স্নাতকোত্তর স্তরের পাঠ শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতীতে। সাংবাদিক হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। কাজ করেছেন অন্য সংবাদপত্রেও। পদ্য-গদ্য প্রকাশিত হয়েছে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘প্রতিদিন’, ‘উনিশ কুড়ি’, ‘সুখী গৃহকোণ’, ‘নতুন কৃত্তিবাস’-সহ নানা পত্র-পত্রিকায়। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মুখ ঢাকো করতলে’, ২০১৬-তে গদ্যগ্রন্থ ’১৫ মেমারি লেন’। এ ২০১৬ সালে পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার ‘দীপক মজুমদার সম্মাননা’ । ১০১৮-তে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘পৌষমেলা : স্মৃতির সফর’। এখন ‘মাসিক কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য তিনি। শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজস্ব নিখিল বইওয়ালা বুক ক্যাফে।)

 

Leave A Reply